হজ্জ যাত্রার পূর্বে যেসকল গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরী
আর কয়েকদিনের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে হজের উদ্দেশ্যে হাজিগণ রওনা হবেন, ইনশাআল্লাহ। এই সময়ে আল্লাহর মেহমান, সম্মানিত হজযাত্রীদের প্রতি কয়েকটি পরামর্শ দিতে চাই।
১. হজের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হোন। একজন হাজির মানসিক অবস্থা কেমন হওয়া উচিত, সেটি নিয়ে পড়াশোনা করুন। হজের নিয়তের পর থেকেই আপনার হজের সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি কার্যক্রম সহীহ ও শুদ্ধ হওয়া দরকার।
২. হজের প্রায় সকল কার্যক্রমের সাথে ইসলামের ইতিহাস জড়িত। সেসব ইতিহাসের মর্মকথাসহ জানা থাকলে প্রতিটি কাজ করার সময় আপনার মানসিকতা তেমনভাবে গড়ে তুলতে পারবেন। যেমন: সাফা-মারওয়ার মাঝে দৌড়ানোর সময় মা হাজেরার মানসিক অবস্থার কথা স্মরণ করতে পারেন। নিজেকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও শিশু ইসমাইলের অভিভাবক, পেরেশান মা হাজেরার জায়গায় কল্পনা করতে পারেন। অনুভব করতে পারবেন, কোন কুরবানির মধ্য দিয়ে তাঁরা গিয়েছেন। নিজের মধ্যেও সে প্রেরণা পাবেন, ইনশাআল্লাহ।
শয়তানকে পাথর মারার সময় ইবরাহীম (আ.)-এর মানসিক অবস্থার কথা স্মরণ করতে পারেন। কুরবানির সময় ইবরাহীম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.)-এর আল্লাহর জন্য কুরবানির ঘটনা স্মরণ করতে পারেন। আল্লাহর জন্য নিজেদের সর্বোচ্চ কুরবানির প্রস্তুতি হয়তো নিতে সক্ষম হবেন, ইনশাআল্লাহ।
৩. হজের হুকুম-আহকামগুলো ভালোভাবে জেনে নিন। এর জন্য পড়াশোনা, ওয়ার্কশপ/আলোচনায় অংশ নেওয়া যেতে পারে। ইউটিউবের দুয়েকটি লিংক কমেন্ট সেকশনে দিচ্ছি, আশা করি আপনার জন্য উপকারী হবে। ভালোভাবে জেনে নিয়ে হক আদায় করে হজের প্রতিটি বিধান পালনের প্রস্তুতি রাখুন। সেই সাথে সহীহ কিছু বই পড়ুন।
৪. হজের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জরুরি দোয়া মুখস্থ করে নিন। আল্লাহর কাছে চাওয়ার জন্য আরও কিছু আরবি দোয়া পারলে মুখস্থ করে নিতে পারেন। আর সম্ভব না হলে, কমপক্ষে বাংলা দোয়া জেনে নিন। রাসূলুল্লাহ (সা.) যেসব দোয়া করতেন, সেগুলো জেনে নিলে খুবই উপকারী হবে। পাশাপাশি আপনার মনের মাধুরী মিশিয়ে আল্লাহর কাছে চাইতে পারবেন। কী কী চাইবেন হজে গিয়ে, সেসবের তালিকা এখন থেকেই করতে পারেন। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে আত্মীয়-পরিজনের জন্য দোয়ার তালিকা তৈরি করতে পারেন। আপনার সমস্ত পূর্বপুরুষ এবং ভবিষ্যতে আগত বংশধরদের জন্যও দোয়া করা দরকার।
৫. হজ করতে গিয়ে আমরা আল্লাহর কাছে বলি: “আল্লাহ, আমি এসে গেছি”, “লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক।” যেন আল্লাহর দরবারে নিজেকে সোপর্দ করার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতিসহ আমরা উপস্থিত হচ্ছি।“লাব্বাইক, লা-শারিকা লাকা লাব্বাইক”—আমি হাজির, আপনার কোনো শরিক নেই। সকল প্রকার শিরকের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর কাছে আমরা উপস্থিত হয়ে যাই। “ইন্নাল হামদা, ওয়ান্নি‘মাতা, লাকা ওয়াল মুলক, লা-শারিকা লাক”—নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা, কৃতিত্ব ও কৃতজ্ঞতা আপনারই প্রাপ্য। সকল নিয়ামত আপনারই। রাজত্বও আপনারই। কোনো ক্ষেত্রেই আপনার কোনো শরিক নেই।
অবশেষে, আমরা হজে গিয়ে আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা হিসেবে নিজেকে হাজির করি। পুরো হজ যাত্রার মধ্য দিয়ে আমাদের এই মুখলিস বান্দা হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা থাকতে হবে। এখন থেকেই সেই প্রস্তুতি নিন।
৬. আরাফার ময়দানে থাকতেই যেন সমস্ত গুনাহ আল্লাহর কাছ থেকে মুছে নিতে পারি, সেই প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তাই এখন থেকেই তাওবাতুন্নাসুহা করা প্রয়োজন। আর হজের সময় তা আরও গুরুত্বের সাথে চালিয়ে যেতে হবে।
৭. হজে গিয়ে বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত প্রায় ৪৫ দিন অবস্থান করেন। দিনে অনেক সময় পাওয়া যায়। এই সময়গুলো কীভাবে ইবাদতের মধ্যে কাটাবেন, সেই প্রস্তুতিটাও প্রয়োজন। সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে এই ৪৫ দিন অনেক ছোট মনে হবে।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের হজকে জীবন পরিবর্তনকারী হজ হিসেবে কবুল করুন। হজ থেকে ফেরার সময় যেন নিষ্পাপ, গুনাহমুক্ত হয়ে ফিরতে পারেন এবং অবশিষ্ট জীবন গুনাহমুক্তভাবে কাটাতে পারেন—সেই দোয়া করছি।
আমাদের সকলকেই আল্লাহ তাআলা হজে মাবরুর নসীব করুন। আমীন।
— লেখক: সিরাজুল ইসলাম (গবেষক ও লেখক)
মন্তব্য করুন

