রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনায় বিএনপির চার জ্যেষ্ঠ নেতা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি। বিষয়টি শুধু সরকারি দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিরোধী দল ও রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। বিশেষ করে প্রশ্ন উঠেছে—বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আর কতদিন দায়িত্বে থাকবেন। তিনি কি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন, নাকি তাকে অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণ করা হবে—তা নিয়েও চলছে আলোচনা।
আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রপতি যদি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করেন, তাহলে তাকে অপসারণের জন্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে। অতীতে ২০০১ সালের পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি নিজেই পদত্যাগ করেছিলেন। তবে সেই ঘটনা বিএনপি সরকারের জন্য বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল বলে রাজনৈতিক মহলে এখনো আলোচনা রয়েছে। এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে অভিশংসনের পথে না গিয়ে ভিন্ন কৌশল নেওয়ার দিকেই ঝুঁকছে বিএনপি—এমন ধারণা রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
সরকারি দলের ভেতরেও এমন আলোচনা আছে যে, দল চাইলে রাষ্ট্রপতি স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়াতে পারেন। তবে বিএনপি এখনই কোনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তে যেতে চাইছে না। দলটির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় রাখছে। প্রথমত, সরকার গঠনের শুরুতেই কোনো বিতর্ক বা অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে চায় না দলটি। দ্বিতীয়ত, জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তৃতীয়ত, বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে চাপ সৃষ্টি করছে, কিন্তু বিএনপি আপাতত সেই দাবির সঙ্গে একাত্ম হতে চাইছে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারও পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। অথচ পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। সে ক্ষেত্রে অন্তত কয়েক মাস পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েও বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতিই দায়িত্বে থাকতে পারেন—এমন একটি হিসাব-নিকাশও আলোচনায় রয়েছে।
এদিকে রাষ্ট্রপতি পদে কারা আসতে পারেন, তা নিয়েও নানা আলোচনা চলছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে। ত্রয়োদশ সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্বও করেছেন তিনি। দলীয় সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে বিশেষ সম্মানের চোখে দেখেন এবং তিনিই ড. মোশাররফের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
দলীয় একটি সূত্রের দাবি, স্বাস্থ্যগত কারণে যদি তিনি রাষ্ট্রপতি হতে না পারেন, তবে তাকে উপযুক্ত মর্যাদায় অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। একইভাবে বিএনপির আরেক প্রবীণ নেতা ড. আবদুল মঈন খানকেও মন্ত্রী সমমর্যাদার কোনো পদ দিয়ে সম্মানিত করার চিন্তাভাবনা রয়েছে। যদিও সংসদের স্পিকার পদে তার নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল, শেষ পর্যন্ত ওই পদে নির্বাচিত হন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
এছাড়া বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামও সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কেও গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এখন পর্যন্ত তিনি সরকারের কোনো পদে আসেননি, তাই তাকে কোথায় রাখা হবে তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলছেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক ধরনের চমক দেখিয়েছেন। কারণ যাদের ওই পদে নির্বাচিত করা হয়েছে, তারা আগে তেমন আলোচনায় ছিলেন না। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চমক থাকতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। বর্তমানে মন্ত্রিসভায় রয়েছেন ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ এবং ডেপুটি স্পিকার হয়েছেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
উল্লেখ্য, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কুমিল্লা-১ ও কুমিল্লা-২ আসন থেকে মোট পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে ড. আবদুল মঈন খান নরসিংদী-২ আসন থেকে চারবার সংসদ সদস্য হয়েছেন। আর গয়েশ্বর চন্দ্র রায় নির্বাচিত হয়েছেন ঢাকা-৩ আসন থেকে।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর এবং সর্বোচ্চ দুইবার এই দায়িত্ব পালন করা যায়। বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শেখ হাসিনার সরকারের আমলে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তার মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত থাকার কথা। যদিও ২০২৪ সালের অক্টোবরে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা আন্দোলন করেছিলেন।
তবে পরে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন জানান, নির্বাচনের পর তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে আগ্রহী। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিজেকে কিছুটা অপমানিত বোধ করছেন। তবুও সাংবিধানিক দায়িত্বের কারণে তিনি এখনো দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
মন্তব্য করুন

