জরাজীর্ণ সিলেট-আখাউড়া রেলপথে বাড়ছে আতঙ্ক: দুর্ঘটনা ও বিকল ইঞ্জিনে চরম দুর্ভোগে যাত্রীরা
ব্রিটিশ আমলে নির্মিত শতবর্ষী সিলেট-আখাউড়া রেলপথ এখন যাত্রীদের জন্য এক অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। জরাজীর্ণ রেললাইন, পুরোনো ইঞ্জিন, ঝুঁকিপূর্ণ সেতু এবং ঘনঘন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রতিনিয়ত ব্যাহত হচ্ছে ট্রেন চলাচল। মার্চ ও এপ্রিল মাসজুড়ে একের পর এক দুর্ঘটনা এবং অন্তত ৩০টি ট্রেন বিলম্বের ঘটনায় এই রুটে যাত্রী ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
বিশেষ করে পর্যটননির্ভর সিলেট অঞ্চলে যাতায়াতকারী যাত্রীদের দুর্ভোগ এখন নিত্যদিনের চিত্র। লক্কর-ঝক্কর ইঞ্জিন আর নড়বড়ে রেললাইন পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত শঙ্কা নিয়ে ভ্রমণ করতে হচ্ছে তাদের।
গত ২৬ মার্চ ভৈরব বাজার জংশনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী একটি ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হলে সিলেট রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ৩১ মার্চ মৌলভীবাজারের ভানুগাছ-শমশেরনগর এলাকায় উপবন এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল হয়। ১ এপ্রিল কুমিল্লায় উদয়ন এক্সপ্রেসের তিনটি বগি বিচ্ছিন্ন হয়ে লাইনের ওপর পড়ে থাকে, আর ট্রেনটি প্রায় এক কিলোমিটার দূরে চলে যায়। সর্বশেষ ২ এপ্রিল হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার মনতলায় তেলবাহী ট্রেনের পাঁচটি ওয়াগন লাইনচ্যুত হলে প্রায় ১৪ ঘণ্টা রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৮৯৮ সালে আসাম ও চট্টগ্রামের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করতে সিলেট, কুলাউড়া ও আখাউড়া হয়ে এই রেলপথ নির্মাণ করা হয়। তবে সময়ের সঙ্গে অবকাঠামোর বড় ধরনের উন্নয়ন না হওয়ায় বর্তমানে রুটটি নানা সংকটে জর্জরিত।
বিশেষ করে পুরোনো ইঞ্জিনের কারণে পাহাড়ি এলাকায় ট্রেন চলাচলে বেশি সমস্যা হচ্ছে। লাউয়াছড়া বনাঞ্চলের উঁচু পথে উঠতে গিয়ে প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ে ইঞ্জিন। রেলওয়ের ২৬১০ ও ২৯০২ নম্বরসহ বেশ কয়েকটি পুরোনো ইঞ্জিন এই রুটে চলাচল করছে, যেগুলো নিয়মিত যান্ত্রিক ত্রুটিতে পড়ছে। ফলে ট্রেনের নির্ধারিত সময়সূচি প্রায় প্রতিদিনই ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে সিলেট রুটে প্রতিদিন ছয়টি আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে চারটি সিলেট-ঢাকা এবং দুটি সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে পরিচালিত হয়। প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার যাত্রী এই রুট ব্যবহার করেন। পর্যটকদের চাপ যোগ হওয়ায় ভোগান্তির মাত্রা আরও বেড়েছে।
এদিকে সিলেট-আখাউড়া রেলপথের অন্তত ১০টি সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে। এসব সেতুতে ধীরগতিতে ট্রেন চালানোর নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি রেললাইনের নাট-বল্টু ও ক্লিপ চুরির ঘটনাও বাড়ছে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। তীব্র গরমে রেললাইন বাঁকা হয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজনের তুলনায় দেশে ইঞ্জিনের ঘাটতি রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে পুরোনো ইঞ্জিন দিয়েই ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) আহমেদ মাহবুব চৌধুরী বলেন, ঈদের পর থেকে এই রুটে ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা বেড়েছে। সমস্যার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান জানান, দেশে প্রয়োজনীয় ইঞ্জিনের মাত্র ৭০ শতাংশ বর্তমানে রয়েছে। নতুন এডিপি প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন তিনি। পাশাপাশি পূর্বাঞ্চলের রেললাইন পুনর্বাসনে নতুন প্রকল্পও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
মন্তব্য করুন

