কুরবানী ও পশু জবাইয়ের শরীয়তসম্মত বিধান: যা সবার জানা জরুরি

প্রকাশনার সময়: ২৬ মে ২০২৬, ০৮:০৩ অপরাহ্ন

 

পবিত্র ঈদুল আজহায় কুরবানী মুসলমানদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি শুধু পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, ত্যাগের মানসিকতা ও তাকওয়ার বাস্তব প্রকাশ। হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর অনন্য আনুগত্যের স্মৃতিকে ধারণ করেই মুসলিম উম্মাহ প্রতি বছর এই ইবাদত পালন করে থাকে।

কুরবানীর নির্ধারিত সময়

কুরবানীর সময় শুরু হয় জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ঈদের নামাজ আদায়ের পর থেকে। ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানী করা যায়। কিছু মাজহাবে ১৩ জিলহজ পর্যন্তও অনুমোদনের মত পাওয়া যায়।

তবে ঈদের নামাজের আগে পশু জবাই করলে তা কুরবানী হিসেবে গণ্য হবে না; সাধারণ গোশত হিসেবেই বিবেচিত হবে। সুন্নাহ অনুযায়ী ঈদের নামাজ ও খুতবার পর কুরবানী করা উত্তম।

কোন পশু কুরবানীর উপযুক্ত

শরীয়ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু গৃহপালিত পশুই কুরবানীর জন্য বৈধ। যেমন— ছাগল, ভেড়া, গরু, মহিষ ও উট।

  • ছাগল বা ভেড়ার বয়স কমপক্ষে এক বছর হতে হবে।
  • গরু বা মহিষের বয়স কমপক্ষে দুই বছর হতে হবে।
  • উটের বয়স কমপক্ষে পাঁচ বছর হতে হবে।

ছাগল বা ভেড়া একজনের পক্ষ থেকে কুরবানী করা যায়। আর গরু, মহিষ বা উটে সর্বোচ্চ সাতজন পর্যন্ত শরিক হতে পারেন।

পশু নির্বাচনে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ

কুরবানীর পশু অবশ্যই সুস্থ, সবল ও ত্রুটিমুক্ত হতে হবে। অন্ধ, খোঁড়া, অতিরিক্ত রোগা, গুরুতর অসুস্থ কিংবা কান-লেজ কাটা পশু কুরবানীর জন্য উপযুক্ত নয়। দাঁতহীন বা চলাফেরায় অক্ষম পশুও অযোগ্য বলে গণ্য হয়।

ইসলামে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পশু নির্বাচনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। কারণ কুরবানী শুধু বাহ্যিক কাজ নয়, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আন্তরিকতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা।

শরীয়তসম্মত জবাইয়ের নিয়ম

ইসলামে পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রেও মানবিকতা ও সহানুভূতির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জবাইকারী মুসলিম হওয়া জরুরি। নিজে জবাই করতে জানা থাকলে তা উত্তম। অন্যথায় বিশ্বস্ত কাউকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।

জবাইয়ের সময় ধারালো ছুরি ব্যবহার করতে হবে, যাতে পশু কম কষ্ট পায়। পশুর সামনে ছুরি শান দেওয়া মাকরূহ। একইভাবে একটি পশুর সামনে আরেকটি পশু জবাই করাও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

জবাইয়ের সময় “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলা সুন্নাহ। অন্তত “বিসমিল্লাহ” বলা অপরিহার্য। এরপর গলার নির্দিষ্ট অংশ কেটে খাদ্যনালী, শ্বাসনালী ও প্রধান রক্তনালী ছেদন করতে হয়।

জবাইয়ের পর পশু পুরোপুরি নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া ছাড়ানো বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাটা উচিত নয়।

মাংস বণ্টনের সুন্নাহ

কুরবানীর মাংস তিন ভাগে বণ্টন করা উত্তম। এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য এবং অন্য এক ভাগ গরিব-অসহায় মানুষের জন্য নির্ধারণ করা সুন্নাহ।

তবে প্রয়োজন অনুযায়ী গরিবদের বেশি অংশ দেওয়াও প্রশংসনীয়। কাঁচা কিংবা রান্না— উভয়ভাবেই মাংস বিতরণ করা যায়।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাসয়ালা

কুরবানীর মূল ভিত্তি হলো নিয়ত। এটি অবশ্যই আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হতে হবে। লোক দেখানো বা সামাজিক মর্যাদার জন্য কুরবানী ইসলামের শিক্ষা নয়।

কুরবানীর পশুর চামড়া নিজে ব্যবহার করা যায়, অথবা বিক্রি করে তার অর্থ সদকা করা যায়। এছাড়া নারীরাও সামর্থ্য অনুযায়ী পুরুষদের মতো কুরবানী আদায় করতে পারেন।

হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কুরবানীর দিনে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো কুরবানীর রক্ত প্রবাহিত করা।

কুরবানী তাই কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ত্যাগ, আনুগত্য ও মানবতার শিক্ষা বহনকারী এক মহিমান্বিত ইবাদত। সঠিক নিয়ম মেনে আদায় করলে এই ইবাদতের প্রকৃত সৌন্দর্য ও তাৎপর্য ফুটে ওঠে।

আল্লাহ তাআলা সকলের কুরবানী কবুল করুন। আমীন।

মন্তব্য করুন