ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা, পাল্টা জবাব দিলো ইরান

প্রকাশনার সময়: ২৬ মে ২০২৬, ০৭:৪৭ অপরাহ্ন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান পরোক্ষ শান্তি আলোচনার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সামরিক উত্তেজনা বেড়েছে। সোমবার দক্ষিণ ইরানে নতুন করে বিমান হামলা চালানোর কথা নিশ্চিত করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ‘আত্মরক্ষা’ এবং ইরানি হুমকি থেকে নিজেদের সেনাদের সুরক্ষিত রাখতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি অবস্থিত ইরানের গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি ও বন্দর নগরী বন্দর আব্বাসের একটি এলাকাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা এবং সমুদ্রসীমায় মাইন বসানোর প্রস্তুতিতে থাকা স্পিডবোটগুলোকে টার্গেট করা হয়েছে। এর আগে স্থানীয় প্রশাসন ওই এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনার বিষয়টি নিশ্চিত করে তদন্ত শুরু করেছিল।

এ হামলার পর মঙ্গলবার পাল্টা প্রতিক্রিয়ার দাবি করেছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করেছে। একই সঙ্গে একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ও আরেকটি ড্রোনের দিকেও গুলি ছোড়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবে ঘটনাগুলোর নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ করা হয়নি।

আইআরজিসি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করলে তার জবাব দেওয়ার “বৈধ ও নিশ্চিত” অধিকার ইরানের রয়েছে। গত ৮ এপ্রিল থেকে দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতি মেনে চললেও, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও ইরানি বন্দরে মার্কিন অবরোধ ঘিরে মে মাসের শুরুতেও উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। যদিও সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, যুদ্ধবিরতি এখনও কার্যকর রয়েছে।

নতুন এই সংঘাতের ফলে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ভারত সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, হামলার পরও সমঝোতার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি।

তিনি বলেন, কাতারের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যস্থতায় ইরানের শীর্ষ আলোচক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনা চলছে। চুক্তির খসড়ার ভাষা নিয়ে এখনো দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক রয়েছে, তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।

রুবিওর ভাষ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি কার্যকর চুক্তি চান। তিনি বলেন, “হয় ভালো চুক্তি হবে, নয়তো কোনো চুক্তিই হবে না।” হরমুজ প্রণালী প্রসঙ্গে তিনি কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, এই নৌপথ অবশ্যই উন্মুক্ত রাখতে হবে। সেখানে ইরানের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই হজ উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছেন। বাবার মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। অজ্ঞাত স্থান থেকে পাঠানো ওই বার্তায় তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য আর মার্কিন ঘাঁটির নিরাপত্তা বলয় হয়ে থাকবে না এবং এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো নিরাপদ আশ্রয় থাকবে না।

মার্কিন গোয়েন্দাদের ধারণা, যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলি হামলায় আহত হওয়ার পর মোজতবা খামেনেই বর্তমানে গোপন স্থানে অবস্থান করছেন। ফলে তাঁর দূতদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে এবং আলোচনার গতি ধীর হয়ে পড়ছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হলেও এখনই চুক্তি সই আসন্ন—এমন দাবি করার সুযোগ নেই।

মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান আলোচনা থেকে তাৎক্ষণিক কোনো স্থায়ী সমাধান আসছে না। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অবরুদ্ধ তহবিল মুক্ত করা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার মতো জটিল বিষয়গুলো পরবর্তী ধাপে আলোচনায় আসবে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর সময় ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছিল, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার খুব কাছাকাছি। সোমবার রাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এই ইউরেনিয়াম হয় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে, নয়তো যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমে ইরানের মাটিতেই ধ্বংস করতে হবে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। জবাবে ইরান ইসরাইল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপক বেড়ে যায়।

বর্তমানে আলোচনায় থাকা সমঝোতা স্মারকের মূল লক্ষ্য হচ্ছে আরও ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা, হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার পথ তৈরি করা।

সূত্র: BBC

মন্তব্য করুন