আরও একটি মসজিদকে মন্দির ঘোষণা করলো ভারত

প্রকাশনার সময়: ২২ মে ২০২৬, ০৭:৪৮ অপরাহ্ন

 

মধ্যপ্রদেশের ধার শহরের ঐতিহাসিক ‘কামাল মাওলা মসজিদ’ বা ভোজশালা কমপ্লেক্সকে ঘিরে বহু বছরের বিতর্কে নতুন অধ্যায় যোগ হয়েছে। রাজ্যের হাইকোর্ট সম্প্রতি রায়ে স্থানটিকে হিন্দুদের জ্ঞান ও বাণীর দেবী ‘বাগদেবী’র মন্দির হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকেই সেখানে মুসলিমদের প্রবেশ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

গত ১৫ মে আদালতের রায় ঘোষণার পর কয়েক দিনের মধ্যেই ১৩-১৪ শতকের এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির পরিবেশ পাল্টে যায়। পুরো এলাকাজুড়ে দেখা যায় গেরুয়া পতাকার উপস্থিতি। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সেখানে দেবীর অস্থায়ী মূর্তি স্থাপন করে ধর্মীয় আয়োজন শুরু করেন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মীরা।

এই পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছেন ৭৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ রফিক। প্রায় পাঁচ দশক ধরে তিনি সেখানে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তাঁর পরিবারের সঙ্গেও মসজিদটির দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। রফিক জানান, তাঁর দাদা দেশভাগের আগ থেকেই এখানে ইমামতি করতেন। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “যে জায়গাটিকে এতদিন নিজেদের উপাসনালয় হিসেবে জেনেছি, সেটি হারানোর কথা কখনো কল্পনাও করিনি।”

মসজিদ-মন্দির বিতর্কটি নতুন নয়। ১৯৫০-এর দশক থেকেই হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো দাবি করে আসছিল, মসজিদের স্থানে আগে একটি মন্দির ছিল। পরে ২০০৩ সালে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই) তত্ত্বাবধানে একটি সমঝোতার মাধ্যমে প্রতি মঙ্গলবার হিন্দুদের পূজা ও শুক্রবার মুসলিমদের নামাজের সুযোগ দেওয়া হয়।

তবে দুই বছর আগে আদালতের নির্দেশে এএসআই সেখানে নতুন করে জরিপ চালায়। সেই জরিপ প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই হাইকোর্ট সাম্প্রতিক রায়ে কমপ্লেক্সটিকে মন্দির হিসেবে ঘোষণা করে। একই সঙ্গে মুসলিম পক্ষের আবেদন খারিজ করে বিকল্প স্থানে মসজিদ নির্মাণের জন্য জমির আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

রায়কে স্বাগত জানিয়েছে হিন্দু পক্ষ। তাদের দাবি, এটি “ঐতিহাসিক বিচার”। অন্যদিকে মুসলিম পক্ষ জানিয়েছে, তারা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবে। মুসলিম পক্ষের আইনজীবী আশহার ওয়ারসি অভিযোগ করেন, আদালত ১৯৩৫ সালের সরকারি গেজেটে স্থানটিকে মসজিদ হিসেবে স্বীকৃতির বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। পাশাপাশি যে ‘বাগদেবী’ মূর্তিকে কেন্দ্র করে মন্দির দাবির বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে, সেটির উৎস সম্পর্কেও বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি তাঁর।

ইতিহাসবিদ ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক অড্রে ট্রুশকে এএসআইয়ের জরিপের সমালোচনা করে এটিকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ও দুর্বল গবেষণা বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, ভারতে মুসলিম স্থাপনাগুলোকে ঘিরে চলমান বিতর্ক ক্রমেই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৪ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিভিন্ন ঐতিহাসিক মুসলিম স্থাপনাকে মন্দির দাবি করার প্রবণতা আরও জোরালো হয়েছে। এর আগে বাবরি মসজিদ থেকে শুরু করে তাজমহল নিয়েও এমন বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হায়দরাবাদের সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন ওয়াইসি তিনি অভিযোগ করেন, প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্থাগুলো রাজনৈতিক চাপের মুখে নিরপেক্ষতা হারাচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, এ ধরনের রায় ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্থাপনাগুলোকে আরও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

মন্তব্য করুন